Sun. Jul 25th, 2021

আত্মহত্যায়প্ররোচনাওআত্মহত্যাপ্রসঙ্গ

এম এ সালেহ চৌধুরী

“আত্মহত্যার প্ররোচনা” নামে কোন অপরাধ নেই দন্ডবিধিতে(1BLC 185)। অপরাধটি হল “আত্মহত্যায় সহযোগিতা”। সহযোগিতা ও প্ররোচনার মধ্যে পার্থক্য আছে। ” ময়না তদন্তের আগে আত্মহত্যা কেমনে হয় ? যাহোক, আমাদের সমাজে “White Collar Criminal” of the society রয়েছে। সমাজ ধ্বংস করার জন্য তারাই যথেষ্ট। মুখোশের আড়ালে আরও কি আছে মাবুদ জানে।

ভারতের মুম্বাইভিত্তিক হিন্দি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বলিউডের একালের জনপ্রিয় অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা-ই নিয়ে চলছিলো জোর জল্পনা-কল্পনা। ১৪ জুন ২০২০ মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় নিজ ফ্ল্যাটে তার ফাঁসিতে ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গত ছয় মাসে নাকি পরপর তার সাতটি সিনেমা হাতছাড়া হয়ে গেছে। তিনি অবসাদে ভুগছিলেন, চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধও নিচ্ছিলেন।

ময়নাতদন্তে আত্মহত্যা বলে রিপোর্ট হয়েছে। বান্দ্রা পুলিশ এখনো তদন্তে আছে এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর। পুলিশের ভাষায় ‘(UD Case’ (Unnatural Death Case)। অনেক বছর আগে আমাদের দেশেও জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর এ রকম অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। পুলিশের তদন্তে আত্মহত্যা বলে রিপোর্ট দেওয়া হলেও অভিযোগকারীদের সান্ত্বনা মেলেনি এখনো।

বিহারের মুজফ্ফরপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এক আইনজীবী বলিউডের প্রতাপশালী খ্যাতিমান আট সিনেমা প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতার বিরুদ্ধে এই আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলার দরখাস্ত হয়। তার অভিযোগ, এই ব্যক্তিরা সুশান্ত সিংয়ের জীবনে ইচ্ছাকৃতভাবে এমন বিপন্ন পরিবেশ সৃষ্টি করেন, যেন সুশান্ত আত্মহত্যা করেন। এই মৃত্যুশোকে সুশান্ত সিংয়ের এক চাচাতো বৌদিও আত্মহত্যা করেছেন।

বিহারে দশম শ্রেণিপড়ুয়া আরেক ভক্ত ছাত্র, হুগলিতে আরেক ভক্ত তরুণীও আত্মহত্যা করেছেন সুশান্ত সিংয়ের মৃত্যুশোকে। ভক্তদের এই আত্মহত্যা তো সুশান্ত সিংয়ের আত্মহত্যারই প্রতিক্রিয়ার ফল। তাহলে, এগুলোতেও তো প্ররোচনার দায় পড়ে সুশান্ত সিংয়ের আত্মহত্যায় কথিত প্ররোচনাকারীদের ওপর!

আত্মহত্যায় প্ররোচনা (Abetment of Suicide) দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধিতে। ভারতেও এই দণ্ডবিধিই চালু আছে এখনো। সময়ে সময়ে কিছু সংশোধন হয়েছে আমাদের এখানে, হয়েছে সেখানেও। আত্মহত্যায় প্ররোচনা বিষয়ে দুটি ধারা আছে। ধারা ৩০৫ নাবালক, নির্বোধ, মানসিকভাবে অসুস্থ, বদ্ধ উন্মাদ বা নেশাচ্ছন্ন কাউকে এ প্ররোচনা দিলে শাস্তি হতে পারে জরিমানাসহ ১০ বছরের (তার কমও) জেল বা যাবজ্জীবন বা ফাঁসি। ধারা ৩০৬ সুস্থ-স্বাভাবিক কাউকে এ প্ররোচনা দিলে হতে পারে জরিমানাসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরের (তার কমও) জেল। আইন বোধ হয় প্ররোচিত হওয়ার দায় খোদ সুস্থ আত্মহত্যাকারীর ওপরও কিছুটা রেখেছে প্রচ্ছন্নভাবে, তাই শাস্তি অনেকটাই কম! আত্মহত্যার চেষ্টা করে সফলকাম হলে তিনি মরে বেঁচে যাবেন! কিন্তু চেষ্টা বিফলে গেলে বিপদ ভারী! তখন পুলিশি চক্করে ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যা চেষ্টার (ব্যর্থ!) দায়ে এক বছরের ঘানি (জেল), সঙ্গে জরিমানা। মৃতের বিরুদ্ধে মামলা চলে না। আত্মহত্যা করে ফেলাকে তাই শাস্তিযোগ্য করা যায়নি। করা হয়েছে তার চেষ্টা আর প্ররোচনাকে।

আত্মহত্যা চেষ্টার মামলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার্য। আমার ওকালতির বয়স দিন কয়েক মাত্র। আত্মহত্যা চেষ্টার মামলা তেমন পাইনি। আত্মহত্যায় প্ররোচনার ৩০৫ ধারার মামলা কেবলই দায়রায় বিচার্য। ৩০৬ ধারা চিফ/অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ/অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও দায়রা যে কোনোটাতে বিচার্য। আমি (সুস্থ স্বাভাবিক লোককে আত্মহত্যায় প্ররোচনা) কয়েকটি মামলা চার্জ শুনানির অবস্থায় পাই। দায়রা ছাড়া আর কোথাও বিচার্য নয় শুধু এমন মামলাই দায়রায় পাঠানোর কথা ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫সি ধারায়, তবুও ৩০৬ ধারার মতো ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও বিচার্য মামলাগুলো দায়রায় কেন পাঠানো হয়, সে আরেক প্রসঙ্গ। আবার, ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড যুগ্ম দায়রা জজই দিতে পারেন, তবু ৩০৬ ধারার মতো সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের মামলাগুলো অতিরিক্ত দায়রা জজে বা বিশেষ দায়রা জজে কেন আসে সে আরেক আলোচনা।

আমার দেখামতো আদালতে থাকা ওই মামলাগুলো দেখি সবগুলোর ঘটনার প্রকৃতি মূলগতভাবে প্রায় একই ধরনের, কেবল স্থান-কাল-পাত্র বদল করা ভিন্ন কাহিনী মাত্র। একটির কথা বলি। ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। আত্মহত্যাকারীর ছেলে গ্রামের দরিদ্র ভ্যানচালক কিছু টাকা ধার নিয়েছিল অপেক্ষাকৃত সচ্ছল আসামির কাছ থেকে। দীর্ঘদিন তাগাদা দিয়েও সে টাকা না পেয়ে আসামি যায় ভ্যানচালকের বাড়ি। তাকে না পেয়ে তার বাবাকে নাকি ‘গালমন্দ’ করে এই ঠকবাজ ছেলে জন্ম দেওয়ার দায়ে, ‘গলায় দড়ি জুটে না!’ এমন বাক্যও ছিল।

দিনকয়েক পর ভ্যানচালকের বাবা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মামলা হয়। তদন্তে পুলিশ আবার একটি ডায়েরির পাতাও উদ্ধার করে! সেই ভ্যানচালকের বাবার লেখা! যেখানে তিনি তার আত্মহত্যার জন্য আসামির ওই গালমন্দের বিবরণ ও যাতনা লিখে রেখে গেছেন! বিচারকের মনে প্রশ্ন, শুধু এই গালমন্দ প্ররোচনা হয় কীভাবে? আসামি তো দড়ি এগিয়ে দেয়নি। গালমন্দের কারণে আর কোনো বিকল্পই কি তার ছিল না? আমাদের আইনজীবী সাহেবরা চার্জ শুনানিতে সচরাচর গরজ করেন না। কেবল তারিখ ধার্যে বিচারকপর শান্তি হয়নি। আসামির আইনজীবীর বক্তব্য বেশির ভাগ সময়ে ‘চার্জ হয়ে যাক স্যার’, বড় জোর ‘হুজুর যা ভালো বোঝেন’। (চার্জ হয়ে গেলে মামলাটা সাক্ষী, যুক্তিতর্কের দীর্ঘ পথে গড়ায়। ডিসচার্জ হয়ে গেলেই মামলা শেষ) এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম দেখার সুযোগ আজ-ও আমার হয় নাই। পিপি, এপিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর, সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর) সাহেবদের কিছু বলার দরকারই পড়ে না। তবু, বিচারক এপিপি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলে, টাকা না পেয়ে এই আসামি আত্মহত্যা করলে কে প্ররোচনার আসামি হতো? তিনি আমতা-আমতা করেন।

আত্মহত্যার মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবনা এলো। দু-এক ছত্র জীবনানন্দ পড়া ছিল, তাই-ই মনে পড়ল

‘তবুও তো প্যাঁচা জাগে;

গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে

আরেকটি প্রভাতের ইশারায় অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।

টের পাই যূথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে

চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা;

মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে থেকে জীবনের স্রোত ভালোবাসে।

যেখানে প্রকৃতির অবস্থা এই যে, শত প্রতিকূলতার মাঝেও কীটপতঙ্গের বাঁচার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। সেখানে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের কিছু বাক্যবাণের কারণে একগাছা দড়ি হাতে নিয়ে নিজ প্রাণনাশ করতে হবে! একি প্ররোচনা নাকি বিপন্ন বিস্ময়! দণ্ডবিধির ১০৭ ধারা দেখলাম। না, কোনোভাবেই এটা প্ররোচনা বা সহযোগিতার পর্যায়ে পড়ে না। কিছু গালমন্দের অনিবার্য ও একমাত্র নিশ্চিত পরিণতি আত্মহত্যা, এমন সম্ভাবনা/আশঙ্কা আসামি কেন, স্বাভাবিক বোধসম্পন্ন যে কারোরই ধারণাতীত। এ কাজে প্ররোচনার অপরাধ ঘটেই না, বিচার করার কী আছে! এসব যুক্তি দিয়ে সবগুলো মামলার আসামিদের ডিসচার্জ করেছিলেন মাননীয় বিচারক ।

২০১৬ সালে আমাদের আপিল বিভাগ কী বলছেন দেখুন ‘Uttering of abusive language will not amount to provocation to commit suicide and does not constitute abetment unless something more is done in pursuance of the said utterance of abuses.’ [APM Sohrab-uz-zaman vs State, 68 DLR (AD) 331]

মূলকথা : অনেক সময় কোথাও একটি লাশ পাওয়া গেলে দালাল আর পুলিশের এক শ্রেণির লোক মিলিয়ে মামলার ব্যবসা হয়। এগুলো একেবারে গোড়াতেই বিচক্ষণতার সঙ্গে চিহ্নিত করা বিচারকের দায়িত্ব।

সতর্কবার্তা : স্ত্রীর আত্মহত্যার ক্ষেত্রে স্বামীর কিন্তু রেহাই নাও মিলতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে প্ররোচনার দায়ে পড়তে পারেন। ‘‘The attending circumstances show that the husband created a situation for which the wife was compelled to commit suicide and thus the husband committed the offence of abetment of suicide which falls within the mischief of section 306 of the Penal Code.’ [The State vs Md. Golam Sarwar @ Ripon, 35 BLD 159]

দড়ি-কলস এগিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুতে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অপরাধ হবে না এমনটা নয়। আত্মহত্যাকারীর জীবনের পরিবেশ, পরিস্থিতি যদি এমনই বিপন্ন করে তোলা হয় যখন সেসবের উপযুক্ত প্রতিকার পাওয়ার আর দ্বিতীয় কোনো বিকল্প থাকে না তখন হয়তো বিপন্ন করা সেসব কার্যকলাপকে প্ররোচনা বলতেও পারেন। তবে, দায় কি শুধু সেই কার্যকলাপ সংঘটনকারীর একার! যে সমাজব্যবস্থা মানুষের জীবনে এমন বিপন্ন অবস্থা তৈরির স্বচ্ছন্দ সুযোগ পরিপালন করে তাকেও কি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না!

লেখক
আইনজীবী
জজ কোর্ট, সিলেট।
চীফ কনসালটেন্ট
দ্যা চেম্বার অব ‘ল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উপদেষ্টা মন্ডলীঃমোঃ দেলোয়ার হোসেন খাঁন(হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ,প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান)
ডঃ দিলিপ কুমার দাস চৌঃ ( অ্যাডভোকেট,সুপ্রিম কোর্ট ঢাকা)
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ অ্যাডভোকেট সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী ।।আইন সম্পাদকঃ অ্যাডভোকেট আবু সালেহ চৌধুরী।।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আজির উদ্দিন (সেলিম)
নির্বাহী সম্পাদক: দিলুয়ার হোসেন।। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোছাঃ হেপি বেগম ।I বার্তা সম্পাদক: মোঃ ছাদিকুর রহমান (তানভীর)
প্রধান কার্যালয় ২/২৫, ইস্টার্ণ প্লাজা,৩য়-তলা ,আম্বরখানা সিলেট-৩১০০।
+8801712-783194 dailyhumanrightsnews24@gmail.com