Wed. Jun 23rd, 2021

‘ভিক্ষা করে খাব, তবু আর বিদেশ যাব না’

স্টাফ রিপোর্টার:
‘আর বিদেশে যাব না। দরকার পড়লে
ভিক্ষা করে খাব। প্রতিদিন মারছে।
খাবার-দাবার নাই। বেতন চাইলেই মারে।
পুলিশে দিছে। ১২ দিন জেলে থাকছি।’
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সৌদি আরব
থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরে পৌঁছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে
এসব কথা বলছিলেন ফরিদা বেগম (৪০)।
ফরিদার সঙ্গে একই ফ্লাইটে একই ধরনের
অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন আরো ৬৪
নারীকর্মী।

ফরিদা বেগমের বাড়ি খাগড়াছড়ির
মাটিরাঙ্গা এলাকায়। এই নারীর স্বামী
সাত বছর আগে মারা গেছেন। এক মেয়ে
চার ছেলে। সন্তানরা মায়ের খোঁজ নেয়
না। তাই ঋণ করে ১১ মাস আগে সৌদি আরব
যান তিনি। গৃহকর্মীর কাজে নেওয়ার পর
পাঁচ মাস হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও তিনি
কোনো বেতন পাননি। ঈদের দিনও
জোটেনি ভালো খাবার।
গতকাল ফিরে আসা নারীরা জানান,
বাংলাদেশ দূতাবাসের আশ্রয়কেন্দ্রেও
হয়রানির শিকার হয়েছেন তাঁরা।
অনলাইনে ভিডিওতে নির্যাতনের কথা
বলায় তাঁদের ওপর খড়্গ নেমে এসেছে।
যাঁরা এখন সৌদিতে আছেন, তাঁরা নানা
রকমের হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
গাজীপুরের কাপাসিয়ার সাবিনা (২০)
চার মাস ১৩ দিন আগে রফিকুল ওরফে
পারভেজ নামে এক দালালের মাধ্যমে
সৌদি আরব যান। নিজের দুর্দশার বর্ণনা
দিতে গিয়ে এই তরুণী বলেন, ‘ফলের
ফ্যাক্টরিতে কাজের কথা বলে আমারে
নিয়ে বাসাবাড়িতে কাজে দেয়। রিয়াদ
থেকে চার ঘণ্টার পথ। এক মাস ২৫ দিন পর
আমি বাধ্য হইয়া পালাইয়া আসছি।’ পাসহ
শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন
দেখিয়ে সাবিনা বলেন, ‘খাবার চাইলে
মারধর করত। পানির লাইন বন্ধ করে
আমারে দুই দিন বাথরুমে আটকাইয়া
রাখছে। দুই মাস জেলে থাইকা আসলাম।’
তিনি আরো বলেন, ‘এমডিসির
(আশ্রয়কেন্দ্র) বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ
আছে। সেখানকার মহিউদ্দিন স্যার
মেয়েদের হয়রানি করেন। ১৫ দিন রাখার
নিয়ম থাকলেও বেশি রাখে। তারা খারাপ
ব্যবহার করে। রওশন নামের যে মেয়েটা
ভিডিও ছেড়ে নির্যাতনের কথা বলছেন
তাঁরে কম্পানি আটকে রাখছে। এমডিসির
এরা ওদের সাহায্য করে। আমাদের
সাহায্য করে না। রওশনের তিনটা ফোন
নিয়া গেছে। তাদের শেখানো মতো কথা
বলতে বাধ্য করে।’

ফাতেমা আক্তার বিউটি (২২) নামের
আরেক তরুণী ২ নম্বর টার্মিনাল থেকে
বেরিয়েই কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন,
‘একটা বাচ্চা ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার
আর কেউ নাই। ওই বাচ্চাটার ভবিষ্যতের
জন্য সৌদি গেলাম। আর কী হইল?’ বিউটি
জানান, মুন্সীগঞ্জে জন্ম হলেও বাবা-মা
না থাকায় তিনি এতিমখানায় বড়
হয়েছেন। বিয়ে হলেও স্বামীর সঙ্গে
বিচ্ছেদ হয়েছে। চার বছরের মেয়ে
জান্নাত আক্তার আলোর ভবিষ্যতের জন্য
সৌদিতে কাজ করতে যান তিনি।
ফিরেছেন নিঃশ্ব হয়ে। মহিলা মাদরাসায়
কাজ দেবে বলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়।
এক বছর চার মাস তাঁর সংগ্রামের গল্প
অন্যদের মতোই।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের মঞ্জু
মিয়ার মেয়ে জান্নাত বলেন, ‘আট মাস
ছিলাম। আল্লাহ বাঁচাইয়া ফিরাইছে। এক
বাসায় কাজ করার সময় বেতন তো পাইনি,
উল্টো মারধরও করা হতো। পরে আমাকে
খারাপ জায়গায় বেচার জন্য নিয়ে
যাচ্ছিল। আমি পালিয়ে বাঁচি।’
ফেরত আসা নারীকর্মীরা বলেন, গত ২৮
আগস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরে
আত্মহত্যার চেষ্টা করা নারীকর্মীর
সঙ্গে তারাও একই আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলেন।
ওই তরুণীর ওপর দূতাবাসের কর্মী লোকমান
ও গোলামের অবিচারের কথা তাঁরা
সৌদিতেই জেনেছেন। এমন আরো
কয়েকজন নারীকর্মী হয়রানির শিকার
হয়েছেন বলে দাবি করেন ফেরত আসা
কর্মীরা।

মানিকগঞ্জের ঘিওরের হুজলিয়া গ্রামের
লালনের স্ত্রী জাহানারা বেগম নির্মম
নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে জানান, সাড়ে
তিন মাস আগে দালালের মাধ্যমে তিনি
সৌদি আরব যান। ফলের দোকানে কাজের
কথা বলে তাঁকে এক বাড়িতে কাজে
দেওয়া হয়, যেখানে মানুষ ছিল ৩০ জন।
দিন-রাত কাজ করতে হতো। খেতে দেওয়া
হতো না। রান্না ঘরে ও বাথরুমে আটকে
রাখা হতো। বন্ধ ঘরে দিন না রাত তাও
বুঝতে পারেননি।
শেরপুরের শফিকুল ইসলামের স্ত্রী
মিনারা বেগম (৩৮) বলেন, স্বামী অসুস্থ
থাকায় বিদেশে কাজ করে তিনিই
সংসারের হাল ধরেন। এর আগে কাতার,
বাহরাইন ও জর্দানে কাজ করেন মিনারা।
তবে আগে এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়নি
তাঁর। পায়ে পোড়া জখম দেখিয়ে মিনারা
কেঁদে বলেন, ‘১০ মাস আগে মাসুম আর
রফিক দালালের মাধ্যমে গেছিলাম।
হাসপাতালের ভিসার কথা বলে ওরা
বাড়ির কাজে দেয়। এমনভাবে পা পুড়িয়ে
দেয় যেন বের না হইতে পারি। আমার
মাথায় ১৮টা সেলাই। মাহারা কম্পানি
(নিয়োগকারী সৌদি সরকারি প্রতিষ্ঠান)
কোনো সাহায্য করে নাই। সেখানে
নিলুফা ও সুমীসহ তিন-চারটা মেয়ে এখনো
বন্দি আছে।’
২ নম্বর টার্মিনালের সামনে দাঁড়িয়ে
ছিলেন ষাটোর্ধ্ব বয়সী সবুরা খাতুন।
এদিক-ওদিক ফ্যালফ্যাল করে দেখছিলেন
তিনি। এক আনসার সদস্যকে দেখে বলেন,
‘আমার মাইয়া ডা আসছে? কোন দিকে
আসবো?’ তিনি বলেন, তাঁর মেয়ে মঞ্জু
আরা দুই বছর আগে সৌদি আরব গেছেন।
ফোন করে জানিয়েছেন যে তিনি ভালো
নেই। কোনো টাকা-পয়সা পাঠাতে
পারেননি। সবুরা মেয়েকে বলেছেন,
‘টাকা-পয়সা লাগবে না, জান নিয়া ফিরা
আসো।’ অনেক অপেক্ষার পর আজ মেয়ে
ফিরেছেন। সবুরা জানান, তাঁর বাড়ি
মাগুরায়। তাঁর একটাই সন্তান। স্বামী
হারেছ মিয়া অসুস্থ। মঞ্জু আরার বিয়ে
দিয়েছিলেন কয়েক বছর আগে। একটি
ছেলে ও দুটি মেয়ে আছে তাঁর। পরে মঞ্জু
আরার স্বামী আবার বিয়ে করেন।
মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন
সবুরা। এরপর মেয়ে ও তাঁর নাতি-নাতনির
ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তায় পড়েন।
একপর্যায়ে একটি মেয়ে জানায়, কয়েক
হাজার টাকা হলে সৌদি আরবে গিয়ে
ভালো কাজ করতে পারবে। আয় ভালো
হবে। এ কথা শুনে এনজিও থেকে ৩০ হাজার
টাকা ঋণ নিয়ে সবুরা মেয়েকে বিদেশ
পাঠান। কথা বলার মধ্যেই বোরকা পরা এক
নারী এসে সবুরাকে জড়িতে কাঁদতে শুরু
করেন। কী হয়েছে জানতে চাইলে তিনি
বলেন, ‘আমি কিছু বলতি পারব না।’ মা-
মেয়ের কান্নায় জড়ো হয় সবাই।
বিমানবন্দরে ফিরে আসা নারীদের
সহায়তা দিতে দেখা গেছে এনজিও
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রগ্রামের
কর্মীদের। তবে প্রবাসী কল্যাণ
মন্ত্রণালয় বা জনশক্তি বিভাগের কোনো
কর্মীকে দেখা যায়নি। ব্র্যাক মাইগ্রেশন
প্রগ্রামের তথ্য কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন
বলেন, রিয়াদ মাহারা হিউম্যান রিসোর্স
কম্পানি ও সফর জেল (ইমিগ্রেশন ক্যাম্প)
থেকে ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজের একটি
ফ্লাইটে করে রাত ৮টা ২০ মিনিটে তাঁরা
পৌঁছান। এর মধ্যে ৩৭ জন ব্র্যাকের
সহায়তা নিয়েছেন। তাঁদের খাবার, বাড়ি
পৌঁছানো, কাউন্সেলিং এবং পরে
কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য সহায়তা দেওয়া
হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উপদেষ্টা মন্ডলীঃমোঃ দেলোয়ার হোসেন খাঁন(হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাস্ট অব বাংলাদেশ,প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান)
ডঃ দিলিপ কুমার দাস চৌঃ ( অ্যাডভোকেট,সুপ্রিম কোর্ট ঢাকা)
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতিঃ অ্যাডভোকেট সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী ।।আইন সম্পাদকঃ অ্যাডভোকেট আবু সালেহ চৌধুরী।।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আজির উদ্দিন (সেলিম)
নির্বাহী সম্পাদক: দিলুয়ার হোসেন।। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোছাঃ হেপি বেগম ।I বার্তা সম্পাদক: মোঃ ছাদিকুর রহমান (তানভীর)
প্রধান কার্যালয় ২/২৫, ইস্টার্ণ প্লাজা,৩য়-তলা ,আম্বরখানা সিলেট-৩১০০।
+8801712-783194 dailyhumanrightsnews24@gmail.com